নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ত্বকী হত্যাকান্ডের আসামি আজমেরী ওসমান ও ওসমান পরিবারের প্রয়াত সদস্য নাসিম ওসমানকে নিয়ে কটূক্তি করলে নারায়ণগঞ্জ অচল করে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন আজমেরি ওসমানের সমর্থকরা।

শুক্রবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আজমেরি ওসমান-সমর্থকদের এক সমাবেশে এই হুমকি দিয়ে জেলা যুব সংহতির আহ্বায়ক এস এম রাজা হোসেন রাজা বলেন, আজমেরী ওসমান নির্দেশ দিলে শত শত ছাত্র-যুবনেতা শহীদ হয়ে যাবে।

সমাবেশের ব্যানারে লেখা ছিল ‘আলহাজ নাসিম ওসমানকে নিয়ে কটূক্তি ও ওসমান পরিবারের জনপ্রিয় যুবনেতা আলহাজ আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সভা’। অনুষ্ঠানে সভাপতি হিসেবে কারো নাম ঘোষণা করা হয়নি।

ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ও সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদের উদ্দেশে এস এম রাজা হোসেন বলেন, ‘প্রয়াত নেতা নাসিম ওসমানকে নিয়ে কটূক্তি করেছেন। আজমেরী ওসমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছেন। হালিম আজাদ, রাব্বিসহ সকলকে বলতে চাই, সাবধান হয়ে যান। সংযত হোন। নইলে নারায়ণগঞ্জের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ শান্ত থাকবে না।’

রাজা হোসেন হুঁশিয়ারি করে বলেন, ‘আজমেরী ওসমান অর্ডার করলে শত শত ছাত্র-যুবনেতা শহীদ হয়ে যাবে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে নারায়ণগঞ্জ শহর অচল করে দেব।’

রাজা ছাড়াও সেখানে বক্তব্য দেন নিতাইগঞ্জ ট্রাক ট্যাংকলরি শ্রমিক কমিটির সভাপতি মাসুদুর রহমান মানিক।

সমাবেশের আগে নগরীতে ঝাড়ু নিয়ে মিছিল করে আজমীর ওসমানের সমর্থকরা। মিছিলটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল থেকে ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি ও নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব কবি হালিম আজাদের বিরুদ্ধে কুৎসিত স্লোগান দেয়া হয়। মিছিল শেষে আজমেরী ওসমানের সমর্থকরা শহীদ মিনারে জড়ো হয়। সেখানে ত্বকীর বাবার কুশপুতুল পোড়ানো হয়।

ত্বকী হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত ৮ ফেব্র“য়ারি বিকেলে শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ত্বকী মঞ্চ। কর্মসূচি শেষে অধিকাংশ কর্মী চলে যাওয়ার পর সেখানে অবস্থানরত সাংস্কৃতিক কর্মীদের ওপর হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েলসহ তিনজন আহত হন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রফিউর রাব্বি বলেন, ‘ত্বকী হত্যা মামলার আসামি আজমীর ওসমান প্রকাশ্যে থাকলে এমন হামলার ঘটনা স্বাভাবিক।’

ওই দিন হামলার আগে সমাবেশে রফিউর রাব্বি বলেন, ‘২০১১ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলাম। সেই নির্বাচনে শামীম ওসমান এক লাখ ভোটের ব্যবধানে আইভীর কাছে পরাজিত হন। এ ছাড়া বাস সেক্টর থেকে চাঁদাবাজির চিত্র জনসম্মুখে তুলে ধরার কারণে আজমীর ওসমান ত্বকীকে হত্যা করে। আজমীর ওসমানকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, কার নির্দেশে সে এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।’

শামীম ওসমানের নির্দেশে ত্বকী হত্যাকাণ্ড হয়েছে দাবি করে রফিউর রাব্বি বলেন, তাকেও বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

নারায়ণগঞ্জের সব সন্ত্রাসের জন্য ওসমানী পরিবারকে দায়ী করে রাব্বি বলেন, ‘১৯৮৮ সালে কামালকে হত্যা করা হলো। এ হত্যাকাণ্ডের ভারসাম্য আনতে তারা নিজেদের কর্মী কালামকে হত্যা করে। দীর্ঘদিন ধরে তারা হত্যাকাণ্ডের রাজনীতি করে আসছে। ক্ষমতায় থাকলে আর প্রশাসন থাকলে তারা দেশে থাকে। ক্ষমতা হারালে বিদেশ পালিয়ে যায়। লুটপাট, ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, খুন করে তারা নারায়ণগঞ্জের আতঙ্ক সৃষ্টি করতে চায়, যাতে তাদের সবাই ভয় পায়। এই ওসমানীয় শাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমাদের পিঁপড়ের মতো মারতে চেয়েছিল। সে নাসিম ওসমান আজ কোথায়? শহীদ মিনারে আমাদের সমাবেশের ওপর হামলা করল। সে পারভেজ কোথায়? কোথায় রেখেছেন শামীম ওসমান তাকে?’

২০১৩ সালের ৬ মার্চ অপহৃত হয় ত্বকী। ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খালে তার লাশ পাওয়া যায়। ত্বকী হত্যা মামলার আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানায়, আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন মিলে ত্বকীকে হত্যা করে।

এই হত্যার ঘটনায় নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানের নাম এসেছিল র‌্যাবের তদন্তেও। তার একটি আস্তানা থেকে রক্তমাখা একটি প্যান্ট উদ্ধার করেছিল বাহিনীটি। তবে আজমেরীর আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।

২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাবের সে সময়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সংবাদ সম্মেলন করে জানান, তারা তদন্ত গুছিয়ে এনেছেন। অচিরেই তা আদালতে জমা দেয়া হবে। তিনি বলেন, ‘আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন ত্বকীকে হত্যা করে।’

২০১৪ সালের ৩০ মে সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান ভারতে মৃত্যুবরণ করলে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওসমান পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্র“তি দেন।’

সাম্প্রতিক এক গোলটেবিল আলোচনায় প্রবীণ সাংবাদিক কামাল লোহানী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্ করে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের বিচার দ্রুত শেষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচার করতে আপনার এত কার্পণ্য কেন?’ বিচার করার ইচ্ছা থাকলে প্রধানমন্ত্রী তা করে দেখান বলেও মন্তব্য করেন কামাল লোহানী।