ডেস্ক নিউজ

শেখ হাসিনা বলেছেন,  বাংলাদেশে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের কোনো স্থান নাই। মাদকাশক্তি থেকে সন্তানদের রক্ষা করতে হবে।

‘এ জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর ছেলে-মেয়েরা যেন লেখাপড়া শিখে মানুষের মত মানুষ হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে’, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহিলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

প্রধানমন্ত্রী নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, নিজেদেরকে কখনও অপাংতেয় ভাবা যাবে না। প্রত্যেকটি মানুষেরই কর্মদক্ষতা আছে, কর্মক্ষমতা আছে। যার যেটুকু আছে সেটা দেশের কাজে লাগাতে হবে। বিশেষ করে যারা রাজনৈতিক কর্মী তাদের একটাই লক্ষ্য থাকতে হবে- রাজনীতির মধ্যদিয়ে আমরা জনগণকে কী দিতে পারলাম। মানুষকে কী দিতে পারলাম এবং আমাদের মা-বোনেরা, তাদের কাছে আমাদের আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের যেতে হবে। তাদের জন্য আমরা যে কাজগুলো করেছি সেগুলো তাদেরকে বলতে হবে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আমাদের মা-বোনদের বলব, আপনারা জানেন- আজকে শুধু বাংলাদেশ না সমগ্র বিশ্বে একটা নতুন উপসর্গ হচ্ছে জঙ্গিবাদের আবির্ভাব।

শেখ হাসিনা বলেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ক্ষেত্রে নারীরাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা মায়ের জাত আর ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানুষ হত্যা করে কীভাবে তারা ইসলাম ধর্ম পালন করছে আমি জানি না। মানুষ হত্যা মহাপাপ, মানুষ হত্যাকারীর স্থান হবে দোজখে।

তিনি বলেন, আমাদের প্রত্যেকটি নেতা-কর্মী ভাই-বোনদের আমি বলব, নিজ নিজ পরিবারে লক্ষ্য রাখবেন ছেলে-মেয়রা কোথায় যায় এবং কার সঙ্গে মিশে, কী করে, পড়াশোনা ঠিকমতো করছে কি না, স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত যাচ্ছে কি না, নিশ্চই সেটার খবর রাখতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস মোকাবিলায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে আহ্বান করেছি এবং ঐক্যবদ্ধ করেছি। সেখানে অভিভাবক, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম এবং ওলামা মাশায়েখগণসহ বিভিন্ন পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যার যার নিজের সন্তানদের রক্ষা করতে হবে। এই সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ এবং মাদকাশক্তির পথে যেন তারা না যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আপনারা দেখেছেন তাদের অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রা কোথায় চলে গেছে। সারা দেশে ৩ হাজার ৩৩৬ জন অগ্নিদগ্ধ এবং সাড়ে ৩০০ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। স্কুলছাত্র অনিক আর হৃদয়কে আমি চিকিৎসা করাচ্ছি। যতই চিকিৎসা করাই তাদের দেখলে কষ্ট লাগে- বোমার আঘাতে তাদের সৃষ্ট ক্ষত সরাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। ৬ বছরের শিশু রুপা, অন্তস্বত্তা নারী মনোয়ারা বেগম, স্কুল শিক্ষিকা শামসুন্নাহার ঝর্ণাও বিএনপি-জামায়াতের অগ্নিসন্ত্রাস থেকে রেহাই পায় নাই।

প্রধানমন্ত্রী ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াতের সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে বলেন, ভোলার লালমোহন ও আশপাশের গ্রামে ১০ বছরের শিশু থেকে ৬৫ বছরের বৃদ্ধ কেউ বিএনপি-জামায়াতের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রেহাই পায়নি। পাক হানাদারবাহিনীর মতই তারা বর্বর সন্ত্রাস-নির্যাতন চালিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বরিশালের গৌরনদী-আগৈলঝড়ায় মা-মেয়েকে একসঙ্গে ধর্ষণ করা হয়েছে। ৫ মাসের অন্ত:স্বত্তা নারী সাবিত্রি দাসের ওপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয়েছে। লজ্জায় তারা অনেকেই কাউকে কিছু বলতে পারেনি। তারা অনেকেই আমার কাছে এসে তাদের এই কষ্টের কথা জানিয়ে গেছে।

তিনি বলেন, রাজশাহীর ৭ বছরের শিশু রজুফা ধর্ষিত হয়েছে। নেত্রকোনাতেও মহিলাদের ওপর নির্যাতন হয়েছে, রাজশাহীতে মহিমা আত্মহত্যা করেছে। খুলনায় রুমাকে তুলে আনতে গেলে সে আত্মহত্যা করে ইজ্জত রক্ষা করেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, রংপুরের নিসবেদগঞ্জে, যারা তীর ধনুক নিয়ে একসময় পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তারাও ভয়াবহ সন্ত্রাস, নির্যাতন ও পাশাবিকতার শিকার হয়েছে। বসতবাড়ি দখল করে রাতারাতি পুকুর কেটে বসতবাড়ি নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। পুকুরের পাশে চুলা দেখতে পেয়ে সেটি যে বসতবাড়ি ছিল তা চিহ্নিত করা গেছে, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি আরো বলেন, মাদারীপুরে ২ বছরের শিশু রোকসানাকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে চুলায় নিক্ষেপ করে হত্যা করেছে বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসীরা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫ বছরগুলোতেও একই কায়দায় জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে নির্যাতন করেছে জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা। একদিকে জাতীয় সম্পাদ ধ্বংস করেছে। পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেছে।

‘সেই দৃশ্যতো এখনো চোখে ভাসে। সেই যন্ত্রণা নিয়ে এখনো অনেকে বেঁচে আছেন,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্মেলন উপলক্ষে সবাইকে অভিন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মার্চ মাস আমাদের স্বাধীনতার মাস। এই মাসেই জাতির পিতা ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা দেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ আবার এই মাসের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জন্মগ্রহণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার মায়েরা বিরাট ভূমিকা পালন করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া, সন্তান ও স্বামীর হাতে অন্যত্র তুলে দিয়ে তাদের মুক্তিযুদ্ধে পাঠানো, যুদ্ধের খবর সংগ্রহ এবং যুদ্ধ কি করেনি তারা।

তিনি বলেন, পিরোজপুর-বরিশালের বিভিন্ন আনাচে-কানাচে হানাদার ক্যাম্পের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের ইতিহাস আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রত্যেক ঘরে যে দুর্গ গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই দুর্গই গড়ে তোলেন বাংলার নারী সমাজ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি আমার মা বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিবের কথা। তিনি ছিলেন জাতির পিতার ছায়াসঙ্গী। কারাগারে থাকার সময় একহাতে সংসার সামলে জাতির পিতার মামলা পরিচালনা করা, সংগঠন চালানো আবার আন্দোলন জমিয়ে তোলা- সবই করেছেন একহাতে।

‘বিশ্বে যা কিছু মহান চিরকল্যাণকর অর্ধেকে তার করিয়াছে নারী অর্ধেকে তার নর।’ মায়ের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনা থেকে এই অংশটি উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধে সম্ভ্রমহারা নারীদের পুণর্বাসনে বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগ তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু তাদের জন্য পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুইজারল্যান্ড থেকে বঙ্গবন্ধু নার্স, ডাক্তার নিয়ে এসে তাদের চিকিৎসা করান। যাদের অ্যাবরশন করানো যায় অ্যাবরশন করান এবং যাদের অ্যাবরশন করানো সম্ভব হয়নি তাদের সন্তান জন্ম দিয়ে বিশ্বের বহুদেশে তাদের পাঠিয়ে পুনর্বাসন করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, তাদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে বঙ্গবন্ধু তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেন। আর তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এসব নারীদের স্বীকৃতি দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব নারীদের অনেকেরই বিয়ের সময় সমস্যা দেখা দিলে বাবার নামের স্থলে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘লিখে দাও পিতার নাম শেখ মুজিবুর রহমান, বাড়ি ধানমন্ডি ৩২।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা সমাজ গড়ে তুলতে হলে সমাজের সবার জন্যই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের একমাত্র সংগঠন যেখানে গঠনতন্ত্র এবং ঘোষণাপত্রেও নারীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় তার সরকারের আমলে দেশে নারীর ক্ষমতায়নের খণ্ড চিত্র তুলে ধরে বলেন, প্রথম সচিব, মহিলা পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক, আর্মি, নেভী, এয়রফোর্সে প্রথম নারী সদস্যদের তার সরকারই নিয়োগ প্রদান করে। শুধু তাই নয়, মহিলা বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, হাইকোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনের জজ হিসেবেও নারীদের নিয়োগ করা হয়।

স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় সংসদে বর্তমানে ২১ জন সরাসরি নির্বাচিত নারী সদস্য এবং সংরক্ষিত আসনে ৫০ জন প্রতিনিধি রয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে নারী উন্নয়নে তার সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরে এর বিপরীতে তার সরকারের ক্ষুদ্র সঞ্চয় নীতির উল্লেখযোগ্য দিকও উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী আশরাফুননেছা মোশাররফ। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও মহিলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি সাফিয়া খাতুন স্বাগত বক্তৃতা করেন। শুভেচ্ছা বক্তৃতা করেন সংগঠনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের মহিলা ও শিশু বিষয়ক সম্পাদক ফজিলাতুননেছা ইন্দিরা এমপি। সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মহিলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পিনু খান এমপি।