পীর হাবিবুর রহমানঃ উৎপল মায়ের কোলে ফিরেছে।  আমার বুকের উপর থেকে ভারি পাহাড় সরে গেছে।  মঙ্গলবার রাত বারোটার দিকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতায় উৎপলকে যারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল তারা ফেলে গেছে।  তারপর ভুলতা পুলিশ ফাঁড়িতে।  এদিকে গণমাধ্যমে আনন্দ চলছে।  টানা দুইমাস দশ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে খবর প্রচার হচ্ছে উৎপল ফিরেছে।  উৎপল সেখান থেকে তার মাকে ফোন করে।  তার বন্ধু রাজিবের সঙ্গে কথা হয়।  আমার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তার স্বভাবসুলভ চঞ্চল ও প্রাণবন্ত চেহারাটি ফুটিয়ে তোলে।  উৎফুল্ল চিত্তে বলতে থাকে, ভাই আমি ভালো আছি, বাড়ি যাবো, বৃহস্পতিবার অফিস করবো।  ভুলতা থানা পুলিশ ফাঁড়িতে রাতে দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা তৃষ্ণার্ত ব্যাকুল হৃদয়ে খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দেওয়া উৎপলের মা ছুটে গেলে সে মায়ের বুকে ঠাই নেয়।  সন্তান যত বড় হোক পৃথিবীতে মায়ের চেয়ে পরম আশ্রয় আর কোথাও তার হয় না।  অজানা অন্ধকার সময় থেকে দুইমাস দশদিন পর ফিরে এসে উৎপল যেন আরেকবার সেই সত্যকে উপলব্ধি করলো।

উৎপলের ভাষ্য অনুযায়ী ১০ অক্টোবর ধানমন্ডির একটি রেস্টুরেন্ট থেকে খাওয়া দাওয়া করে বের হলে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা তাকে দূরের কোথাও জঙ্গলের মধ্যে একটি ঘরে বন্দী করে রাখে।  তার কাছে অর্থ দাবি করেছে।  কখনো সখনো বলেছে, টাকা না দিলে মেরে ফেলবে।  শেষপর্যন্ত চোখ বেধে যেভাবে নিয়ে গিয়েছিল তেমনি চোখ বেধেই তাকে ভুলতা ফেলে যায়। বলে দেয়, পেছনে না তাকাতে।  পঁঞ্চাশ গজ দূরে পেট্রোল পাম্পের কথাও শুনিয়ে দেয়।  সেখান থেকেই উৎপল তার মায়ের সঙ্গে আগে কথা বলে।  তারপর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।  এই দুই মাস দশদিন আলাভোলা বোহেমিয়ান ধরনের সংবাদকর্মীদের প্রিয়মুখ উৎপল নিখোঁজ থাকায় তার মা দরজা খুলে পথ চেয়ে বসে থাকতেন।  বিষন্ন চেহারায় স্কুল শিক্ষক গরীব পিতা নির্বাক দৃষ্টিতে ফ্যালফ্যাল করে তাকাতেন।  তার স্নেহময়ী দিদিরা অশ্রুজলে বুক ভাসাতেন।  গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিদিন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন।  উৎপলের সন্ধানে যতখানি যাওয়া যায় ততখানি ছুটে গেছি।  যদি কেউ তাকে ফিরিয়ে আনতে পারেন সন্ধান বের করতে পারেন এই আশায়।  দুদিন পরপর উৎপলের বাবা যখন ফোন করতেন পৃথিবীতে আমার নিজেকে সবচেয়ে অসহায় মানুষ মনে হতো।  আমি আশাবাদী কাকা, ধৈর্য্য ধরেন, অপেক্ষা করেন উৎপল ফিরে আসবে, এর বাইরে কিছু বলতে পারতাম না।

উৎপলের জন্য তার বন্ধুরা গণমাধ্যমকর্মীরা যা করেছে তাতে আমরা সবাই মুগ্ধ হয়েছি।  অভিভূত হয়েছি।  উৎপলকে নিয়ে সমাজের দেশ বিদেশের নানা পাঠকেরা গভীর উদ্বেগ ও আকুতি জানিয়েছেন।  মানবিক দৃষ্টিকোণে তাদের মমত্ববোধ আমাদের আপ্লুত করেছে।  উৎপলের জন্য গণমাধ্যমে অনেকে লেখালেখি করেছেন।  অগণিত সাধারণ মানুষ কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করেছেন উৎপল যেন সুহালে ফিরে আসে।  আমাদের উৎপল সুহালে মায়ের কোলে ফিরেছে বুকের উপর থেকেও যেন ভারি পাহাড় সরে গেছে।  আমরা চাই না উৎপলের মায়ের  মতো আর কোনো মা এতোদিন সন্তানের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকুক।  উৎপল তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঝড় থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে আত্মউপলব্ধি করুক।  পরিবার সমাজ পেশার প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে উঠুক।  পেশাদারিত্বের জায়গায় সৃজনশীলতা মেধা ও পরিশ্রমের বিনিময়ে জ্বলে উঠুক।  উৎপলের জন্য আমাদের শুভকামনা।  সূত্র-পূর্বপশ্চিম বিডি