বর্তমান সরকারের সামনে তিনটি চ্যালেঞ্জ-ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী

20

নিউজ প্রতিদিন ডটনেট : ছাব্বিশের জুলাইয়ের প্রায় অর্ধেকটাই দেশের রাজনৈতিক সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা, বিরোধিতা, হানাহানি, মারামারি, রক্তপাত চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। এরই মধ্যে আবার কানাঘুষা হচ্ছে শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে কে আসবে—তা নিয়ে চলছে জল্পনা কল্পনা। বিষয়গুলো অনেকেই সাদামাটাভাবে নিচ্ছেন যে, জুলাই মাস চলে এসেছে বলেই এনসিপি পদযাত্রায় নেমেছে, তাদের অস্তিত্ব ও উপস্থিতিকে জানান দেওয়ার জন্যে। জামায়াতের অবস্থা— “ধরি মাছ না ছুঁই পানি”; বরং বক্তব্য, বিবৃতি, হুঙ্কারে তারা সরকারেরই বিরোধিতা করেছে, যদিও তা ছিল অত্যন্ত সংযতভাবে। বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করলে, বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সরকারের জন্য সামনে কিছু চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে; শিক্ষিত সচেতন দেশপ্রেমিক প্রতিটি নাগরিকের কাছেই— তা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।

প্রথম যে বিষয়টি—দেশে জামায়াত এনসিপি ১১ দলীয় জোটের ব্যাপক আস্ফালন, মিছিল-মিটিং আর কথায় কথায় সরকারকে মসনদ থেকে নামিয়ে দেওয়ার হুঙ্কার, স্থূল দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষের কাছে নিছক রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি মনে হলেও আমার কাছে কেন যেন মনে হয় এসব কিছুর পিছনে আটলান্টিকের ওপারের মোড়ল রাষ্ট্রটির ডিপ স্টেট এর রোল প্লে হচ্ছে।

মনে করুন, এই মুহূর্তে বর্তমান সরকারকে যদি পরিবর্তন করা হয়, স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে— রাষ্ট্র পরিচালনায় কারা আসবে? জামায়াত এনসিপির পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা নেওয়া ও পলিটিকাল স্টেবিলিটি ফিরিয়ে আনা মোটেও সম্ভব নয়। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সেনা শাসন আসার পথ সুগম হবে। সেটা তথাকথিত গণতান্ত্রিক পরিবেশ, বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃত্তির জন্য কত বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে —তা কি একবারও আমরা চিন্তা করেছি? তার সহজ জবাব— অনেকে অনেক কিছু চিন্তা করার পরেও ব্যক্তি স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বার্থের কাছে আদর্শকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত হয়ে যায়; যেটা নৃতাত্ত্বিকভাবে খুব বেশি বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত।

এখন একটু ভিন্ন আলাপে যাচ্ছি‌। এনসিপি কি জেনে-বুঝেই সরকার বিরোধী কঠোর অবস্থানে গিয়েছে? কোনো পক্ষ থেকে কি তাদেরকে প্রলোভন দেওয়া হয়েছে? এ সরকার যদি Fall করে, এ সরকার যদি ব্যর্থ সরকার হিসেবে প্রমাণিত হয়, এনসিপিকে কি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হবে? যদি এ ধরনের প্রলোভন থেকে থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই তাদেরকে মনে রাখতে হবে, সেটি তাদের জন্য ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়, তারা ধোঁকায় নিপতিত হবে—তাতে কোন সন্দেহ নেই।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে ডিসেম্বর মাসে। দেশব্যাপী যে বিষয়টি চাউর হয়েছে, এটিকেও সাদামাটাভাবে দেখার কোনও সুযোগ নেই। এখানেও আটলান্টিকের ওপারের সেই মোড়ল রাষ্ট্রটির ডিপ স্টেটই নোংরা খেলা খেলছে। তার কারণ বর্তমান বিএনপি সরকারকে সেই কথিত পরাশক্তি নামক দেশটি আর ভরসা করতে পারছে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর এবং মায়ানমার ও চায়নার করিডোরে বাংলাদেশের সংযোগ—এসব কিছুই দক্ষিণ পূর্ব চীন সাগর এলাকায় সে দেশটির আধিপত্যকে খর্ব করবে। সেজন্য বর্তমান সরকারের প্রতিও তাদের কোন আস্থা নেই। তারা বিকল্প হিসেবে চিন্তা করতে পারে যে, আওয়ামী লীগকে আবার পুনর্বাসন করা যায় কিনা। রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা আওয়ামী লীগ সেই শক্তিধর রাষ্ট্রটির দেশ বিরোধী প্রস্তাবনাকে মেনে নিবে কিনা—সেটাও সময় বলে দিবে। তার কারণ হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সচেতন সকলেরই জানা যে, যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতে চায়নার প্রভাবকে খর্ব করার জন্য আমেরিকা মূলত ভারতকে গোমস্তা হিসেবে ব্যবহার করে। সেজন্য ভারতের অনেক অনুরোধ ও আবদার তাদের রক্ষা করতে হয়। ভারত সরকার ভালো করেই জানে যে, বাংলাদেশে তাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক দল একটাই, সেটা হচ্ছে আওয়ামী লীগ। তাদেরকে যদি পুনর্বাসিত করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের কোন সুযোগ আর থাকে না। আমার তো মনে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক কূটনৈতিক সার্জিওর বাংলাদেশের তিন দিনের সফরে আওয়ামী লীগকে অ্যাক্সেস দেওয়ার জন্যে এবং শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাধা না দেওয়ার বিষয়ে সরকারকে যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। যদিওবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিল বিষয়টিকে জাতির কাছে স্পষ্ট করেননি।

বর্তমান সরকারের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে—পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা। জামায়াত, এনসিপিসহ জুলাই আন্দোলনের সমর্থক গোষ্ঠী সকলেরই চাওয়া পাওয়া ড. ইউনূসকে প্রেসিডেন্ট করা হোক। কিন্তু সেটা হবে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ ড. ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পরে ১৮ মাসে মার্কিন আগ্রাসনকে বাংলাদেশে সুগম করার জন্যে প্রাথমিক সব কাজই তিনি করে গিয়েছেন; যা নির্বাচনের ০৩ দিন আগে আমেরিকার সাথে করা চুক্তি থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিওবা এই সরকার এমনকি বিরোধীদল বা এনসিপির পক্ষ থেকেও সেই চুক্তি বাতিলের দাবিতে জাতীয় সংসদে কোন ডিবেট হয়নি। কারণ আমরা বুঝতে পারি, এসব কিছুই পাতানো খেলা। অনাকাঙ্ক্ষিত একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে সংবিধান সংশোধন ও সংস্কার— এই ইস্যুতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সংসদ ব্যস্ত ছিল। কিন্তু চুক্তি নিয়ে কোন বিতর্কই হয়নি। কোন বিতর্ক সরকারও করেনি, বিরোধী দলেরও এই বিষয়ে কোন সদিচ্ছা ছিল বলে— আমার মনে হয় না। ড. ইউনূসকে যদি কোনভাবে প্রেসিডেন্ট বানানো যায়, তাহলে আমি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, বর্তমান সরকার তার পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে পারবে না— তা শতভাগ নিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ।

তাহলে প্রেসিডেন্ট কাকে দেওয়া উচিত?
অনেকেই বিএনপির ফখরুলের কথা বলে, কেউ আবার ড. মঈনের কথা বলে। বিএনপির চেয়ারপার্সন বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্ট মনে রাখতে হবে, কোনো বাম কিংবা ডানের বাম কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা নাই, এমন কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি বানানো বিএনপির সবচেয়ে বড় আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত হবে; যা নিছক নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই না।

আপাতত দৃষ্টিতে আমি মনে করি, বর্তমানে যিনি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন; তাকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে সকল মহলের পক্ষ থেকেই বিএনপি সমর্থন পাবে এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতাও জাতি মেনে নিবে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এই সকল সমস্যাগুলো সমাধান করার জন্য বর্তমান সরকারের যে ধরনের গোয়েন্দা তৎপরতা প্রয়োজন, think-tanks ও পলিসি মেকার দরকার—তা আছে বলে আমার মনে হয় না। মা-র্কি/ন ডিপ স্টেটকে মোকাবিলা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে, যারা C -IA এবং মো -সা/দের টুটি চেপে ধরতে পারে, পৃথিবীর দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা তুরস্কের এমআইটির সহযোগিতা বর্তমান সরকার নিতে পারে এবং তাদের সাথে রাজনৈতিক চিন্তার বিনিময়ও করা যেতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে আমার মনে হয়, এই চ্যালেঞ্জ গুলো মোকাবিলা করাই বিএনপির সবচেয়ে বড় কাজ।