সংস্কৃতি ও ধর্ম: আরববিশ্ব ও বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে

96

বাইরের বিশ্বকে আমরা কিভাবে বিচার করি সেই শিক্ষাই দেয় সংস্কৃতি। ফলে শান্তি ও টেকসই উন্নয়নের যে অপরিহার্য উপাদান সহনশীলতা তারই উপলব্ধি মানবজাতি অর্জন করে সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে। বিশ্ব ইতিহাসে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতিতে যত হানাহানি এবং ঔপনিবেশিক শক্তি সৃষ্টি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এই সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের ভেতর ধর্মও একটি অনুঘটকের কাজ করেছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য সংস্কৃতি একটি মানবগোষ্ঠীর অন্তর্গত শক্তি যার উপাদানগুলো হলো, মানুষের সাথে মানুষের ব্যবহার, তার খাদ্যাভ্যাস (রন্ধন প্রণালীসহ), ভাষা, বিনোদন ও অভ্যাস যা ঐ মানবগোষ্ঠীকে একটি সর্বজনীন একাত্মতার অনুভূতি এনে দেয় এবং এমনকি ঐ মানবগোষ্ঠীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও পারস্পরিক ব্যবহারও এর অন্তর্ভুক্ত। ইংরেজিতে একে বলা হয় সভ্য ও সংস্কৃতিকবান হবার ইঙ্গিত বা ‘সেমিওটিক্স’। এর সাথে ধর্মীয় উৎসবও যুক্ত। ধর্ম ও সংস্কৃতির সহাবস্থান মানবজাতির জন্যই মঙ্গলজনক কারণ ধর্মের অনেক আচার অনুষ্ঠান যেমন কোনো একটি নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমারেখায় বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে, তেমনি সেই ভৌগলিক সীমার অভ্যন্তরের সকল ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে থাকে। এটি অতি প্রয়োজনীয় কারণ কোনো মানবগোষ্ঠীই তার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে টিকে থাকতে পারে না।

সম্প্রতি বাংলা নববর্ষ উদযাপন নিয়ে ধর্মীয় বক্তব্য সোচ্চার হচ্ছে। বাংলা বর্ষপঞ্জির সৃষ্টি ও এর ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ না করেই আমি আমার কিছু অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করতে চাই। আমি দীর্ঘ চার বছর এক আরব দেশে ছিলাম। তা ছাড়াও আরও বেশ ক’টি আরব দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও আমার আছে। আমি দেখেছি সেই সব দেশে ইসলাম-উত্তর সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের প্রতুলতা। বিয়ে বা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উলুধ্বনি দেয়া কিংবা বিয়ের গাড়ি সাজানোর জন্য বার্বিডল ব্যবহার করা থেকে শুরু করে মেয়েদের গান গাওয়া এবং নাচ। শুধু তাই নয়, আমি অনেক অনুষ্ঠানে বেলি-ডান্স’ও দেখেছি যেটি ইসলাম-উত্তর যুগে নীলনদের পাশ দিয়ে যে আরব সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেই ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে এই একবিংশ শতাব্দীতেও বর্তমান। উট ও ঘোড়-দৌড়ের প্রতিযোগিতায় এবং সেই উৎসবে মেয়েদের খোলা-চুলের নাচ ও পানাহারে (প্রধানত গাহোয়া বা চা) আমি উপস্থিত ছিলাম একাধিকবার। অনেকেই বলবেন এসব ইসলাম-বিরোধী। আমি বলব এই হলো মানবজীবন যাপনের নির্মল স্বতঃস্ফূর্ততা। কারণ হিজাব পরলেও যে নারীরা পশুর হাত থেকে রক্ষা পায় না তার জ্বলন্ত উদাহরণ তনু-পশু তো কারও কথা শোনে না-সে সভ্যতা ও সংস্কৃতিরও তোয়াক্কা করে না। ধর্মও তাকে সংযত করতে পারে না। তবে একথাও ঠিক পশুরাও অনেক বিচারে মানুষের চেয়ে সভ্য-যেমন তারা ধর্ষণ করে না। ইসলাম যে দেশ থেকে ভারতবর্ষে এসেছে, তা সে আরবদেশ থেকেই হোক বা পারস্য থেকেই হোক- সে দেশগুলোতে বিভিন্ন বিনোদন অনুষ্ঠান, যা তাদের অমূল্য উত্তারাধিকার, ইসলাম-পরিবর্তি যুগেও যুক্তিসঙ্গতভাবেই পালিত হচ্ছে। যেমন ইরানে ‘নওরোজ’ অনেক জাঁকজমকভাবে উদযাপন করা হয়। সৌদি আরবে জমাদ্রিয়া জাতীয় উৎসব পালিত হয় প্রতি ফেব্র“য়ারিতে রিয়াদ থেকে ত্রিশ মাইল দূরে জমাদ্রিয়া শহরে যেখানে লোকজ নাচ-গানসহ ঘোড়া ও উটের দৌড় প্রতিযোগিতা এবং স্বরচিত কবিতা পাঠের জন্য দূরদূরান্ত শহর ও গ্রাম থেকে নারী-পুরুষ একত্রিত হয় টানা দু’সপ্তাহের জন্যে। এ ছাড়াও সৌদি আরবে নিয়মিত বাজ উড়ানোর খেলা (ঋধষপড়হ’ং ভষরমযঃ মধসবং) হয় যেটি পুরাকালের আরব সংস্কৃতি। জুন-জুলাইয়ে জেদ্দা শহরে প্রায় দু’শ বিভিন্ন বিনোদন প্রদর্শনী হয়ে থাকে সৌদি আরবের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসামগ্রী ও আতশবাজী সহকারে। অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী মুসলিম দেশ দুবাই এবং আমিরাতে হরহামেশাই ঘোড়-দৌড় এবং এমনকি জ্যাজ ফেস্টিভ্যাল হয়ে থাকে, যদিও জ্যাজ ইসলামী সংস্কৃতি নয়। এমন উদাহরণ আরও অনেক আছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো ঐসব মুসলমান দেশগুলোতে কি এমন কোন ফতোয়াবাজ নেই? আমি ব্যক্তিগতভাবে এইসব উদাহরণ দিয়ে একাধিকবার যুক্তি খাড়া করতে চেয়েছি আঞ্চলিক সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পক্ষে, তখন যে মন্তব্য শুনতে হয়েছে তা এই: ‘ওরা খাঁটি মুসলমান না’। পরিহাসের বিষয় হলো আমার আরব দেশে বসবাসকালে অনেকবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে, ‘তুমি কি মুসলমান?’ আমার সম্মতিসূচক উত্তরে ওরা বলেছে ‘তুমি আসলে তিন দিনের মুসলমান আর আমরা খাঁটি মুসলমান।’

যে কোন দেশ, ভৌগলিক অঞ্চল এবং সেখানে বসবাসরত মানবগোষ্ঠীর একটি অতীত আছে এবং সেই অতীতকে অস্বীকারের অর্থ নিজের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। এই অতীতেরই একটি সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে সেই মানবগোষ্ঠীর ঐতিহ্য চেতনা, উৎসব ও সংস্কৃতি। কোন ধর্মই উৎসবকে অস্বীকার করে না বলেই পূজা, বুদ্ধপূর্ণিমা, বড় দিন ও ঈদকে ধর্মীয় সংস্কৃতিতে স্থান দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমার জানামতে কোথাও উল্লেখ নেই অপরাপর সকল সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে বিসর্জন দিতে হবে। তাই বাংলা নববর্ষকে বিসর্জন দেয়ার অর্থ বাঙ্গালিত্বকে বিসর্জন দেয়া, নিজেকে বিসর্জন দেয়া।

সবাইকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা।